বিজেপি সরকার বাংলায় আসার পরই বদলে গেল ইতিহাসের পরিচয়, মুছে ফেলা হল সিরাজউদ্দৌলা উদ্যানের নাম


নিজস্ব সংবাদদাতা, বারাসাত:-রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ঘিরে নতুন বিতর্ক দানা বাঁধছে। এবার সেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল বারাসাত। বুধবার দীর্ঘদিনের পরিচিত সিরাজউদ্দৌলা উদ্যান-এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হল শিবাজী উদ্যান। আর এই নাম পরিবর্তনের ঘটনাকে ঘিরেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক।
অনেকের মতে, এটি শুধুমাত্র একটি উদ্যানের নাম বদল নয়, বরং বাংলার ইতিহাস ও বাঙালির আত্মপরিচয়কে ধীরে ধীরে মুছে ফেলার একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। কারণ, সিরাজউদ্দৌলা নামটি শুধু একজন নবাবের পরিচয় নয়, বরং উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন প্রতিরোধের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের ইতিহাস আজও বাঙালির স্মৃতিতে বিশ্বাসঘাতকতা ও পরাধীনতার প্রতীক হয়ে রয়েছে। যুদ্ধের পরে আত্মগোপনে থাকার সময় তাঁকে ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং শেষ পর্যন্ত করুণ পরিণতির শিকার হতে হয়। ইতিহাসের বহু গবেষক মনে করেন, সিরাজউদ্দৌলাকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে যে একপাক্ষিক নেতিবাচক প্রচার চালানো হয়েছে, তার অনেকটাই রাজনৈতিকভাবে নির্মিত। বরং তাঁর শাসনকালে ধর্মীয় সহাবস্থান ও প্রশাসনিক সংস্কারের একাধিক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
সেই কারণেই বারাসাতে তাঁর নামে একটি উদ্যান থাকা অনেকের কাছেই ছিল বাংলার ঐতিহাসিক স্মৃতির অংশ। কিন্তু বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই নাম মুছে দিয়ে শিবাজী মহারাজ-এর নামে উদ্যানের নামকরণ ঘিরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সমালোচকদের বক্তব্য, শিবাজী ভারতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেও তাঁর সঙ্গে বাংলা বা বাঙালির সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কোথায়? কেন বাংলার মাটিতে বাংলার ইতিহাসকে সরিয়ে অন্য এক রাজনৈতিক প্রতীককে সামনে আনা হচ্ছে?
অনেকের আশঙ্কা, এ শুধু একটি নাম পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং ধীরে ধীরে বাংলার নিজস্ব ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে বদলে দেওয়ার বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। একসময় যে বাংলা নবজাগরণ, সাহিত্য, স্বাধীনতা আন্দোলন ও বহুত্ববাদের জন্য গোটা দেশে আলাদা পরিচিতি পেয়েছিল, আজ সেই বাংলার ঐতিহ্যই প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে।
সোশ্যাল মিডিয়া জুড়েও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। একাংশ বলছেন, ইতিহাসকে বদলে ফেলা যায় না, কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি মুছে দেওয়ার চেষ্টা অবশ্যই করা যায়। আর সেই চেষ্টাই কি এখন বাংলায় শুরু হয়েছে? প্রশ্ন তুলছেন বহু মানুষ।
বাংলার কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াই যে আগামী দিনে আরও তীব্র হতে চলেছে, এই ঘটনাই যেন তার নতুন ইঙ্গিত দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *